:

তারেক রহমানের নতুন সরকারের যাত্রা: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

top-news

দীর্ঘ দুই দশকের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের পর, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির এই ভূমিধস বিজয়কে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের রাজনীতির একটি ‘ঐতিহাসিক বাঁক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশ্লেষকরা নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মব সন্ত্রাস রোধ, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের নির্বাচনটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে।

৩০০ আসনের সংসদে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা ২১২টি আসন লাভ করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) মাত্র৬টি আসন পেয়েছে। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯.৪৪%। শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব
নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে যে, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী অর্থনীতি চাপে পড়েছে।

দেশে বর্তমানে স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার  ১৩% -এর বেশি। বৈশ্বিক ধাক্কা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে তৈরি পোশাক খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে। সাধারণ মানুষ দ্রুত দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতির লাগাম টানার দাবি জানাচ্ছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে একজন ভোটার উল্লেখ করেন, "আমরা চাই তারা কাজ করুক, দাম কমাক এবং দুর্নীতি বন্ধ করুক।"

মব সন্ত্রাস, মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু পরিস্থিতি

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং মব সন্ত্রাস (গণপিটুনি) নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায়  ৯% ধর্মীয় সংখ্যালঘু (অধিকাংশ হিন্দু)। তাদের নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে ব্যাপক গরমিল রয়েছে:
 বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের মতে, ২০২৫ সালে মোট ৬৪৫টি** সহিংস ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে মাত্র ৭১টি ছিল সাম্প্রদায়িক প্রকৃতির। বাকিগুলো জমি বা ব্যক্তিগত বিরোধ।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ: তাদের দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর ২,৭১১টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ৯২টি হত্যাকাণ্ড ১৩৩টি মন্দিরে হামলা এবং ৪৭টি জমি দখলের ঘটনা রয়েছে। ভারত সরকার দাবি করেছে, তাদের কাছে ২,৯০০-এর বেশি ঘটনার তথ্য রয়েছে।

দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড
বিবিসি একটি বিশেষ প্রতিবেদনে ময়মনসিংহে হিন্দু শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসের (২৮) নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরেছে। ধর্ম অবমাননার গুজবে তাকে কর্মস্থল থেকে বের করে হাজারো মানুষের সামনে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং পরে গাছে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কিন্তু এটি বাংলাদেশে মব জাস্টিসের ভয়াবহতা এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রতীক হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে।

পররাষ্ট্রনীতি: ভারত ও অন্যান্য বিশ্ব

তারেক রহমানের সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে ভারতের সাথে সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং বিগত ১৮ মাসে সীমান্তে উত্তেজনা ও সংখ্যালঘু ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্কে শীতলতা বিরাজ করছে। তবে শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার উপস্থিতি সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিকে এখন ভারতের সাথে বাণিজ্য ও ভিসা ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে হবে। ভারতও বিএনপিকে মেনে নিয়ে নতুন করে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে।

 ড. ইউনূস তার বিদায়ী ভাষণে ভারতের "সেভেন সিস্টার্স" (উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো) কে নেপাল ও ভুটানের সাথে মিলিয়ে আঞ্চলিক অর্থনীতির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন, যা ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে।

তারেক রহমান চীনকে "উন্নয়ন বন্ধু" হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা বেইজিংয়ের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অটুট রাখার ইঙ্গিত দেয়। একইসাথে যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীর উপস্থিতি পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্ক জোরদারের বার্তা বহন করে।

আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোর মতে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য একটি বিশাল বিজয় হলেও, দেশের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা, সংখ্যালঘুদের আস্থা অর্জন এবং মব জাস্টিসের সংস্কৃতি বন্ধ করা—এই তিনটিই হবে নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য অগ্নিপরীক্ষা। সন্ত্রাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *